আধুনিক বাংলা কবিতার নির্জনতম ও মরমী কবি জীবনানন্দ দাশের অগ্রন্থিত ও পরবর্তীকালে সংকলিত কবিতা সংকলন ‘পাণ্ডুলিপি’ (২০০৫)-র পঞ্চম খণ্ডের একটি অত্যন্ত পরাবাস্তব, গভীর দার্শনিক ও অনন্য সৃষ্টি হলো ‘হে অনাদি প্রেম’। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত এই গ্রন্থে কবির মানসলোকের এমন কিছু রূপ ও ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে, যা প্রচলিত সমাজ-ভাবনা ও প্রচলিত ঈশ্বরচেতনার সীমানা ছাড়িয়ে এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে গেছে।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | হে অনাদি প্রেম |
| কবির নাম | জীবনানন্দ দাশ |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পাণ্ডুলিপি (৫ম খণ্ড) |
| প্রকাশের বছর | ২০০৫ (সম্পাদনা: গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ) |
| কবিতার ধরন | পরাবাস্তব, মরমী ও দার্শনিক লিরিক কবিতা (Surreal and Mystical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) নিবাসী ছিলেন। বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ এবং রূপসী বাংলার কবি হিসেবে তিনি সর্বজনবিদিত হলেও তাঁর বহু কবিতা জীবদ্দশায় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তীকালে গবেষক গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৪টি খণ্ডে প্রকাশিত ‘পাণ্ডুলিপি’ সংকলনটি কবির সেই গোপন ও অবহেলিত সৃষ্টিগুলোর এক অমূল্য ভাণ্ডার। ‘হে অনাদি প্রেম’ কবিতায় কবি ঈশ্বর, প্রেম এবং সৃষ্টির এক অদ্ভুত ও unconventional (অপ্রথাগত) রূপকল্প তুলে ধরেছেন, যেখানে পার্থিব ব্যর্থতা ও শূন্যতার মাঝে স্বয়ং ঈশ্বর এক দীর্ঘ নারীর রূপে নেমে আসেন।
হে অনাদি প্রেম – সম্পূর্ণ কবিতা
পৃথিবীর কোথাও প্রেম পেলাম না যখন
তখন ঈশ্বর নিজে নেমে এল
পৃথিবীর অপরিজ্ঞাত কোনও এক স্থির অসামাজিক সমুদ্রের কিনারে
পৃথিবীর অমেয় এক গাঢ় রাত্রির পরিস্ফুট সমুদ্রের কিনারে
এক দীর্ঘ নারীর রূপে
পশ্চিম আকাশের গোলাপ
পৃথিবীর নদীতে কখন নিভে গিয়ে
সুনীতিশায়ী সম্পাদকের টেবিলের কালি হয়ে গেছে
আর পৃথিবীর পুরোহিতদের অগোচরে এই নিষিদ্ধ ফুল ফুটল
শেয়াল-মানুষ মহিষ-মানুষেরা ঘুমিয়েছে সব;
পৃথিবীর পবিত্র অগ্রসর এখন স্থগিত।
হে অনাদি কল্পনা, হে অনাদি প্রেম,
তুমি আমার জন্য অবৈধ নারীর রূপ ধরলে:
তোমার রূপের দিকে তাকিয়ে জেগে ওঠে হৃদয়ের ভিতর
লাল নীল কাচের জানালা, হাতির দাঁতের মূর্তিকে আলোকিত ক’রে
সোনার ডিমের মতো চাঁদ
উঁচু-উঁচু প্যাগোডার মতো নিস্তব্ধ নদী।
মেহগিনিবীথির জাফরিকাটা ছায়ার ভিতর
জ্যোৎস্না কি কখনও ফুরায়, বিধাতা?
প্রণয় কি স্থবির হয় কখনও? প্রেম কি শুয়ারের মাংস
হয়ে যায় কোনও দিন?
হে অনাদি কল্পনা, হে অনাদি প্রেম!
Romanized Version
Prithibir kothao prem pelam na jokhon
Tokhon ishwor nije neme elo
Prithibir oporigghato kono ek sthiro ashamajik shomudrer kinare
Prithibir omeyo ek garho ratrir porisphuto shomudrer kinare
Ek dirgho narir rupe
Pashchim akasher golap
Prithibir nodite kokhon nive giye
Sunitishayi shompadoker tebiler kali hoye geche
Ar prithibir purohitder ogochore ei nishiddho phul futlo
Sheyal-manush mohish-manushera ghumiyeche sob;
Prithibir pobitro ogroshor ekhon sthogito.
He onadi kolpona, he onadi prem,
Tumi amar jonno obhodho narir rup dhorle:
Tomar ruper dike takiye jege othe hridoyer bhitor
Lal nil kacher janala, hatir dater murtike alokito kore
Sonar dimer moto chad
Uchu-uchu pagodar moto nishtobdho nodi.
Mehgini-bithir jafrikata chhayar bhitor
Jyotsna ki kokhonoi furay, bidhata?
Pronoy ki sthobir hoy kokhonou? Prem ki shuyarer mangsho
Hoye jay kono din?
He onadi kolpona, he onadi prem!
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
-
পার্থিব প্রেমে ব্যর্থতা ও ঈশ্বরের আগমন:
“পৃথিবীর কোথাও প্রেম পেলাম না যখন / তখন ঈশ্বর নিজে নেমে এল / পৃথিবীর অপরিজ্ঞাত কোনও এক স্থির অসামাজিক সমুদ্রের কিনারে…”— পার্থিব সমাজে খাঁটি প্রেমের অনুপস্থিতি ও নিঃসঙ্গতা যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন পরমেশ্বর বা ঈশ্বর নিজে প্রচলিত নিয়মের বাইরে এক অসামাজিক ও রহস্যময় সমুদ্রের কিনারে নেমে আসেন।
-
অবৈধ রূপ ও পরাবাস্তব চিত্রকল্প:
“হে অনাদি কল্পনা, হে অনাদি প্রেম, / তুমি আমার জন্য অবৈধ নারীর রূপ ধরলে…”— জীবনানন্দ এখানে প্রচলিত সামাজিক নৈতিকতার বাইরে গিয়ে প্রেমের এক গভীর ও অলৌকিক রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে ঈশ্বর প্রথাগত সীমানা ভেঙে কবির কাছে আবির্ভূত হন।
-
প্রকৃতি ও মহাজাগতিক রূপায়ণ:
“সোনার ডিমের মতো চাঁদ / উঁচু-উঁচু প্যাগোডার মতো নিস্তব্ধ নদী। / মেহগিনিবীথির জাফরিকাটা ছায়ার ভিতর / জ্যোৎস্না কি কখনও ফুরায়, বিধাতা?”— লাল-নীল কাচের জানালা, হাতির দাঁতের মূর্তি, প্যাগোডার মতো নদী এবং মেহগনি বীথির জ্যোৎস্না—এই সমস্ত পরাবাস্তব ও অনন্য চিত্রকল্প কবিতার আবহকে এক অতীন্দ্রিয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি জীবনানন্দ দাশের অগ্রন্থিত কবিতার সংকলন ‘পাণ্ডুলিপি’ (৫ম খণ্ড, ২০০৫) থেকে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।