আজ এই ভোরবেলা কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ১৪তম খণ্ডে রচিত। যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

আজ এই ভোরবেলা কবিতা
কবিতা: আজ এই ভোরবেলা কবিতা
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

আজ এই ভোরবেলা ছড়ায়ে রয়েছে সাদা সাধারণ ধারণার মতো
যেই সব দিন তুমি জেনেছিলে এক-দিন- তাদের মতন।
কোথাও দ্বিরুক্তি নেই।
অনেক বছর পার হয়ে তুমি আজ
যদি এই সকালকে দেখে যেতে এ-জায়গায় এসে;
যেমন ঘুমায়ে আছ কোনও স্থানে সে-রকম অবিকল সত্যের নির্দেশে।
যদিও একটি যুগ কেটে গেছে- তবুও সময়
স্থানান্তরিত হয়ে যায় নাই- কোথাও হুবহু এক চুল
তেমনই আঞ্জির-গাছে মাখনের মতো সাদা ফুল
এখানে ঘাসের ‘পরে শুয়ে আছি ব’লে বেজি অনধিক ভয়
পেয়ে যায়- আমার শরীর এই সমবেত রোদের ভিতরে
অপরের দেহ ব’লে যদি মানবাত্মা তাকে নিঃসংশয় করে
এমন সন্দেহ তবে তবুও নতুন কিছু নয়
(তবুও শরীর ছিল পৃথিবীতে আরও ঢের
প্লেটো’র মতন সব দার্শনিকদের
মুলতুবি মামলার নিবিড় বিষয়।)
সমস্তই পৃথিবীর ধূসর জিনিস।
চারি-দিকে মহিরুহ থেকে ঢের ক্ষুদ্র ব্যস্ত ফুল
ঘাসের ভিতরে প’ড়ে ডুবে যায়- এ-রকম ডুবে যেত সেই দিনও ভোরে
কোথাও শিশির নেই- শিশিরের মতো শব্দ ক’রে
মাথার উপরে কালো আঁকাবাঁকা ডাল
পরস্পরের সাথে মিশে গিয়ে তেমনই সকাল
এখনও ধারণা করে- সকালবেলার রোদে তাদের গায়ের ছাতকুড়ো
আলোকিত হয়ে ওঠে, ঘুম ভেঙে কুকুরেরও ঠিক এ-রকম খাড়া হয় কান
ডালে ডালে প্রতিটি হলুদ পাখি জানে আজও কতখানি ধান
কতটুকু চাল দেয়- কী ক’রে-বা পৃথিবীর পাখিদের স্বতন্ত্র সম্মান
বেঁচে থাকে- কী ক’রে তবুও তারা তার পর গান
গেয়ে যায়;
অবহিত হয়ে থেকে কোনও এক সঙ্গীতের স্কুল
কী ক’রে বানাই তবু- আমি আজ দারুময়- তোমার শরীর সব স্থূল
অনুষঙ্গ থেকে খ’সে মিশে গেছে ছায়ার ভিতরে
যেমন সত্যের মতো কে আজ অনপনেয় ভাবে অনুভব করে
জীবনকে সে-রকম।
বিকেলে গাছের ছায়া বেড়ে গেছে- মিশে যাবে ব’লে
অদ্ভুত বৃত্তের থেকে নেমে এসো তুমি আজ
অদ্ভুত বৃত্তের থেকে নেমে এসো অগণন হে হলুদ পাখি
চাঁদের শিঙের কাছে একটি একাকী তারা বৃষ আর রূপসির পরিবেদনার মতো না কি?

জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমানে বাংলাদেশ) অন্তর্গত বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন৷ তার পূর্বপুরুষগণ বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর(বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) পরগণার কুমারভোগ নামক স্থানে “গাওপারা” গ্রামের নিবাসী ছিলেন যা পদ্মায় বর্তমানে বিলীন হয়ে গেছে৷ স্থানটি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় অবস্থিত৷
তার পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৩৮-৮৫) বিক্রমপুর থেকে বরিশালে স্থানান্তরিত হন৷সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন৷ তিনি বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন এবং তার মানবহিতৈষী কাজের জন্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হন৷