ধূসর বিড়ালের ঝগড়া কবিতাটি কবি জীবনানন্দ দাশ এর পাণ্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের ৫ম খণ্ডে রচিত। যা ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। গৌতম মিত্র ও ভূমেন্দ্র গুহ-এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। কবির অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর একটি হলো পাণ্ডুলিপি। এই গ্রন্থটি মোট ১৪টি খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে।

ধূসর বিড়ালের ঝগড়া
কবিতা: ধূসর বিড়ালের ঝগড়া
কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ
কবি: জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থের নাম: পাণ্ডুলিপির কবিতা

ধূসর বিড়ালের ঝগড়া- সারা-রাত তাদের মৈথুনের তাড়স
ধলি কালি বিড়ালদের কামনার ঝগড়া
কালো সমুদ্রের জলে হেজে-যাওয়া নাবিকদের লণ্ঠন চুরমার হয়ে ভাঙছে শুধু
বিপিন ভুঁইমালী তার এঁটো কাঁসার বাসনগুলো নিয়ে
সারা-রাত জলের ভিতর মাছের মতো খেলছে
এই বসন্তের রাতে সে-খেলা কী-যে চমৎকার!
কিন্তু, হৃদয়, এ সমুদ্র নয়- পাড়াগাঁর পুকুর নয়
কলকাতার দুপুর-রাতের একটা মরখুট্টি গলি
মূক ও বধির ইলিশ-মাছ-ভাজার গন্ধে কড়াইয়ের উপর চড়েছে এই গলি
সারা-দিনের কাজ-কর্মের পর কড়াইয়ের উপর বিশ্রাম করছে
(ইলিশ-মাছের তেল কি কডলিভার-অয়েলের মতো?)
ইঁদুর-ঠোকরানো বোয়াল-মাছের মুখ ডাঙার উপরে বেঁচে উঠেছে আবার
(মরা মাছটাকে ঝাঁপির তলে ঢেকে রাখতে ভুলে গেছিল কে রে!)
হাঁ ক’রে তার সুখ-দুঃখের কথা বলছে:
কবে কুষ্ঠ হয়েছিল- কী ক’রে পাড়াগাঁর থেকে পালিয়ে কলকাতায় এল
এখানকার রাস্তায়-ঘাটে- হাইড্রেন্ট’এ- শিশুদের খেলার মাঠে সে এক চাঁই
স্বর্গে এসে পৌছেছে- কলকাতার হারেমেও সে এক সলোমন যেন
ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা: হাঁ ক’রে তিনঠেঙো এক স্ত্রীলিঙ্গকে বলছে সে সব
সেই করুণাময়ীকে- (উর্বশীকে নয়- সেই দুঃখ-সাধিকাকে)

সারা-দিনের বেজাহান খাটুনির পর
ধোপার গাধাগুলো দার্শনিকের মতো একটু চিন্তার স্থিরতা চায়:
‘পরলোকের জন্য কী প্রতিষ্ঠিত হল?’
ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা: হাঁ ক’রে তিনঠেঙো এক স্ত্রীলিঙ্গকে বলছে সে সব
চাঁদ-গলার গেঞ্জি, লুঙ্গি, কানে বিড়ি, হাতের রিস্টওয়াচ্’এ বিড়ি গুঁজে
গলির মধ্য-রাত্রির ভিতর অবিনশ্বর প্রেম
ঘাড়ের উপর চাঁদি পর্যন্ত পালিশ মাংস নিয়ে দেখা দিল
(বেকার সে- বেকার বটে- পুরূরবার মতো
কোথায় উর্বশী?- হা- হা- কোথায় উর্বশী)
(উর্বশী) খোলার-ঘরে নিকটেই কোথাও আছে
কিন্তু বিড়ি ও বেতো রিস্টওয়াচ্’এর ঊর্ধ্বে ঢের উপরে, ভাই
পাঁচ সিকে পয়সার গরম ইন্দ্রলোকে
কোনও মহতোমহীয়ানকে নিয়ে আজ সে ব্যস্ত
ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা ঙ্যা: হাঁ ক’রে তিনঠেঙো এক স্ত্রীলিঙ্গকে বলছে সে সব
ইলিশ-মাছের তেল কি কডলিভার-অয়েলের মতো?
জানি না, এদের ইলিশ-মাছে সে-রকম তেল আছে কী-না,
গঙ্গা’র টাটকা ইলিশ? নোনা মাছ? না, মাছের ছিবড়ে?
পুলিশের খবরদারির দুরূহ হ্যাঙ্গিং-ব্রিজ পার হয়ে
চলো, হৃদয়, মনুমেন্টের দিকে যাই
সেখানকার ঘাসে ও এক-রাশ নক্ষত্রের ভিতর;
সেখানে বাতাস কী-যে সাদা- বাতাস পরলোকের।
ইহলোকের জন্য কী প্রতিষ্ঠিত হল!