‘আলো পৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থের ‘সমুদ্রচিল’ কবিতা — জীবনানন্দ দাশ

জীবনানন্দ দাশের ‘সমুদ্রচিল’ কবিতাটি তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরে প্রকাশিত ‘আলো পৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। সমুদ্র, রৌদ্র, তরঙ্গ, আকাশ ও সমুদ্রচিলের গতিময় উপস্থিতির মধ্য দিয়ে কবিতাটি জীবন, আকাঙ্ক্ষা, বিজ্ঞান, সভ্যতা, প্রকৃতি এবং মৃত্যুচেতনার এক বিস্তৃত কাব্যিক জগৎ নির্মাণ করেছে।

‘আলো পৃথিবী’ জীবনানন্দ দাশের অগ্রন্থিত কবিতাবলি থেকে প্রকাশিত কাব্যসংকলনগুলোর অন্যতম। কবির মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এতে মোট ৬২টি কবিতা স্থান পেয়েছে। ফলে ‘সমুদ্রচিল’ শুধু একটি সামুদ্রিক দৃশ্যের কবিতা নয়; জীবনানন্দের পরবর্তী কাব্যচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

কবিতার মৌলিক তথ্য

বিষয় তথ্য
কবিতা সমুদ্রচিল
কবি জীবনানন্দ দাশ
কাব্যগ্রন্থ আলো পৃথিবী
প্রথম প্রকাশ ১৯৮১
প্রকাশ-প্রেক্ষাপট কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত অগ্রন্থিত কবিতার সংকলন
কাব্যগ্রন্থে কবিতার সংখ্যা ৬২টি

‘আলো পৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ-প্রেক্ষাপট

জীবনানন্দ দাশের বহু কবিতা তাঁর জীবদ্দশায় পৃথক কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়নি। কবির মৃত্যুর পর তাঁর অগ্রন্থিত কবিতাগুলো নিয়ে বিভিন্ন সংকলন প্রকাশিত হয়। ‘আলো পৃথিবী’ সেই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ।

১৯৮১ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে মোট ৬২টি কবিতা রয়েছে। গ্রন্থটির কবিতাগুলোতে জীবনানন্দের পরিচিত প্রকৃতি-চেতনার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান, সভ্যতার সংকট, মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ইতিহাস ও মৃত্যুচিন্তার নানা মাত্রা দেখা যায়।

কবি জীবনানন্দ দাশ

জীবনানন্দ দাশ বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি কখনও নিছক দৃশ্য নয়; তা মানুষের স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, অস্তিত্ব ও মৃত্যুচেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

‘সমুদ্রচিল’ কবিতায় সমুদ্রের বিপুলতা এবং একটি সমুদ্রচিলের স্বাধীন গতির বিপরীতে মানুষের দীর্ঘ সভ্যতাযাত্রা ও আত্মসন্ধানকে দাঁড় করানো হয়েছে। ফলে কবিতাটি একই সঙ্গে প্রকৃতির এবং মানুষের কবিতা হয়ে উঠেছে।

সম্পূর্ণ কবিতা

সমুদ্রচিলের সাথে আজ এই রৌদ্রের প্রভাতে
কথা ব’লে দেখিয়াছি আমি;
একবার পাহাড়ের কাছে আসে,
চকিতে সিন্ধুর দিকে যেতেছে সে নামি;
হামাগুড়ি দিয়ে ভাসে ফেনার উপরে,
মুছে যায় তরঙ্গের ঝড়ে।
স্বপ্ন নাই- দাঁড়ায়েছি শতাব্দীর ধুলো কাঁচ হাতে।
(সে শুধু রঙের ছবি রৌদ্রের প্রভাতে)

তরঙ্গের তাড়া খেয়ে চ’লে যায় আরও দূর তরঙ্গের পানে
ফেনার কান্তারে-
বৃষ্টির প্রথম রোদ যেইখানে
তাহার সোনালি ডানা ঝাড়ে;
যেখানে আকাশ নীল কোলাহলময়,
সমুদ্র করিছে দূর সমুদ্র সঞ্চয়,
দিগন্ত হারায়ে যায় দিগন্তের প্রাণে।
(চ’লে যায় দূর- দূর- তরঙ্গের পানে)

চঞ্চল ধবল বুকে নাচিতেছে ফেনার আঙুল;
ধানের শিষের মতো দু’-পায়ের শিরা
নাচিছে স্প্যানিশ টাঙ্গো নীল ঢেউয়ে;
হৃদয় করিছে পান মালাবার হাওয়ার মদিরা;
ট্রুম্-ট্রুম্ ট্রাম্-ট্রাম্- ড্রামের মতন
শৈলে-শৈলে সমুদ্রের রুক্ষ আন্দোলন:
রৌদ্রে-রৌদ্রে ঝলসায় ঝিনুকের ফুল।
(সিন্ধুচিল, ওই মত্ত সমুদ্রের ফেনার আঙুল)

বিজ্ঞান কি মস্তিষ্কের বাক্সের মতন একাকী?
তোমার শরীরে জল- দ্রাক্ষার আঘ্রাণ;
তোমার হৃদয়ে পেকে ঝরিতেছে রৌদ্রের খেত,
জাগিতেছে নব-নব শস্যের সন্তান;
আমরা বন্দরে ফিরি- জনতায়-বসা মাংসে মুখ রাখি ঢাকি
ঘূর্ণিস্রোতে কুকুরের ক্ষুব্ধ লোল আঁখি
পাবে না কি লেজ তার? হো- হো- পাবে না কি!
(পাবে না কি লেজ খুঁজে কুকুরের মতো লোল আঁখি?)

কত দূর ছেড়ে দিয়ে… উত্তরের বাতাসের প্রাণে
জন্মেছে তোমার ডানা- জেগেছে হৃদয়;
সহস্র শতাব্দী- আহা, কাটায়েছি পথ আর ঘরের আঘ্রাণে-
আনন্দের পাই নি ক’ তবু পরিচয়;
জন্মে নি ধবল ডানা বিজ্ঞানের অণ্ডদ্বয় চিরি;
ভেঙ্গে গেছে আকাশের- নক্ষত্রের সিঁড়ি,
উৎসব খুঁজেছি রাত-বিরেতের গানে।

(খুঁজি নাই আলোকের জানালায়- সমুদ্রের প্রাণে)
পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়ায়েছি মনোবীজ, আহা,
আকাঙ্ক্ষার নিঃসঙ্গ সন্তান;
অথবা ঘাসের দেহে শুয়ে-শুয়ে কুয়াশায়
শুনেছি ঝরিতে আছে ধান;
অথবা সন্ধ্যার নীল জনালায়
অদৃশ্য কোকিল এসে গায়
এইসব বেদনার কর্কট শুধু; রেডিয়ামে সারে না ক’ তাহা।
(হৃদয়ের পথে-পথে এই সব ছড়ায়েছি, আহা)

মাঝে-মাঝে একবার ধরা দেই নক্ষত্রের হাতে
চ’লে আসি সমুদ্রের পাশে;
যে খেত ফুরাতে আছে- ফুরাইয়ে গেছে
তার তৃষ্ণা মিটিছে আকাশে;
চেয়ে দেখি সেই নীল আকাশের ছবি;
সমুদ্রের অজান্তব জানালার গল্পের সুরভি;
রৌদ্রের ডানার ভেসে সেইখানে পৃথিবী হারাতে
(চাই আমি; সমুদ্রচিলের খেলা তুলে নিয়ে হাতে)

২

রঙিন বিস্তৃত রৌদ্রে প্রাণ তার করিছে বিলাস;
কোনও দিন ধানখেতে পৃথিবীর কৃষকের প্রাণ
এই রৌদ্র পায় নাই,- জলপাই পল্লবের ফল,
জ্যৈষ্ঠের দুপুরে মাছি যে উল্লাসে গেয়ে গেছে গান,
কুমারী কোমল ঘাড় নুয়ে চুপে যেই পক্ক রৌদ্রে বেণী করেছে বিন্যাস,
নীল হয়ে বিছায়েছে পৃথিবীর মধুকূপী ঘাস,
তরমুজ খেতে শুয়ে স্বপন দেখেছে চৈত্রমাস,
(তার চেয়ে আরও ঘন গাঢ় মদে প্রাণ তার করিছে বিলাস।)

পৃথিবীতে যেই রূপ কোনও দিন দেখে নাই কেউ;
সিংহলের হীরা রত্ন নারী লুটে নাবিকের দল
ভারত সমুদ্রে নেমে নক্ষত্রের রজনীতে
তারপর ভোরবেলা দেখেছিল স্ফটিকের মত যেই জল;
তরঙ্গের ‘পরে ঘন তরঙ্গের মধু আর দুধ,
মেঘের গোলাপি মুখ- রৌদ্রের বুদ্বুদ;
তবু তারা দেখে নাই পুরুভুজ-বিছানায় নূপুর বাজায়ে নাচে ঢেউ
(বারুণির জানালায়: সিন্ধুচিল-মক্ষিকারা ছাড়া তাহা জানে না ক’ কেউ।)

অনেক রূপের স্মৃতি- ধ্বনিত ঢেউয়ের অগ্নি বয়ঃসন্ধি দিবসের স্তন হয়ে রক্তে নেমে আসে!
কবেকার!- তরঙ্গের উষ্ণ নীল তরমুজ খেতে
আমারে খুঁজিয়া পায় মৃত্যু যেন;
বিস্তৃতির পথে যেতে-যেতে
সমস্ত পৃথিবী যেন মিশে যায় রৌদ্রের সাগরে;
সিন্ধুচিল আর তার বনিতা যেখানে খেলা করে;
তাদের ধবল পাখা চোখে যেন ধীরে-ধীরে নীল হয়ে আসে
(মরণ আমারে যেন পায় সেই দারুচিনি হাওয়ার আশ্বাসে।)

Romanized Version

Samudrachiler sathe aj ei raudrer probhate
kotha bole dekhiyachhi ami;
ekbar paharer kachhe ashe,
chokite sindhur dike yetchhe se nami;
hamaguri diye bhase fenar upore,
muche jay toronger jhore.
Swapno nai- dariyechhi shotabdir dhulo kanch hate.
(Se shudhu ronger chhobi raudrer probhate)

Toronger tara kheye ch’le jay aro dur toronger pane
fenar kantare-
bristir prothom rod jeikhane
tahar sonali dana jhare;
jekhane akash nil kolaholomoy,
samudra korichhe dur samudra sonchoy,
digonto haraye jay digonter prane.
(Ch’le jay dur- dur- toronger pane)

Chonchol dhabol buke nachitechhe fenar angul;
dhaner shisher moto du’-payer shira
nachichhe Spanish tango nil dheuye;
hridoy korichhe pan Malabar hawar modira;
trum-trum tram-tram- dramer moton
shaile-shaile samudrer rukkh andolon:
raoudre-raoudre jholsay jhinuker phul.
(Sindhuchil, oi matto samudrer fenar angul)

Biggan ki mostishker bakser moton ekaki?
Tomar shorire jol- drakshar aghran;
tomar hridoye pake jhoritechhe raudrer khet,
jagitechhe nobo-nobo shosshyer shontan;
amra bondore firi- jonotay-bosa mangshe mukh rakhi dhaki
ghurnisrote kukurer khubdho lol ankhi
pabe na ki lej tar? Ho-ho- pabe na ki!
(Pabe na ki lej khunje kukurer moto lol ankhi?)

Koto dur chhere diye… uttorer bataser prane
jonmechhe tomar dana- jegechhe hridoy;
sohosro shotabdi- aha, katayechhi poth ar ghorer aghrane-
anonder pai ni k’ tobu porichoy;
jonme ni dhabol dana bigganer onddodwoy chiri;
bhenge gechhe akasher- nokkhotrer siri,
utshob khunjechhi rat-bireter gane.

(Khunji nai aloker janalay- samudrer prane)
Prithibir dike dike chhorayechhi monobij, aha,
akankshar nisshonggo shontan;
othoba ghasher dehe shuye-shuye kuashay
shunechhi jhorite achhe dhan;
othoba shondhyar nil janalay
odrishyo kokil eshe gay
eishob bedonar korkot shudhu; rediame sare na k’ taha.
(Hridayer pothe-pothe ei shob chhorayechhi, aha)

Majhe-majhe ekbar dhora dei nokkhotrer hate
ch’le ashi samudrer pashe;
je khet furate achhe- furaiye gechhe
tar trishna mitichhe akashe;
cheye dekhi sei nil akasher chhobi;
samudrer ojantob janalay golper surabhi;
raudrer danay bhese sei khane prithibi harate
(chai ami; samudrachiler khela tule niye hate)

2

Rongin bistrit raudre pran tar korichhe bilash;
kono din dhankhete prithibir krishoker pran
ei roudro pay nai,- jolpai pallober phol,
joishther dupure machhi je ullashe geye gechhe gan,
kumari komol ghaar nuye chupe jei pokko raudre beni korechhe binyas,
nil hoye bichhiyechhe prithibir madhukupi ghas,
tormuj khete shuye swopno dekhechhe Choitromas,
(tar cheye aro ghon gadho mode pran tar korichhe bilash.)

Prithibite jei rup konodin dekhe nai keu;
Singholer hira rotno nari lute nabiker dol
Bharat samudre neme nokkhotrer rojonite
tarpor bhorbela dekhechhilo sphotiker moto jei jol;
toronger ‘pore ghon toronger modhu ar dudh,
megher golapi mukh- raudrer budbud;
tobu tara dekhe nai purubhuj-bichhanay nupur bajaye nache dheu
(Barunir janalay: sindhuchil-mokkhikara chhara taha jane na k’ keu.)

Onek ruper smriti- dhonito dheuyer agni boyoshondhi diboser ston hoye rokte neme ashe!
Kobekar!- toronger ushno nil tormuj khete
amare khunjiya pay mrityu jeno;
bistritir pothe jete-jete
shomosto prithibi jeno mishe jay raudrer sagore;
sindhuchil ar tar bonita jekhane khela kore;
tader dhabol pakha chokhe jeno dhire-dhire nil hoye ashe
(moron amare jeno pay sei daruchini hawar ashashe.)

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

সমুদ্রচিল ও স্বাধীনতার অনুভব

কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র সমুদ্রচিল। সে পাহাড় থেকে সমুদ্রের দিকে যায়, তরঙ্গের ওপর ভাসে, আবার আরও দূর তরঙ্গের দিকে চলে যায়। তার চলাচলে কোনো স্থিরতা নেই, অথচ সেই অস্থিরতার মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের স্বাধীনতা।

কবির নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে সমুদ্রচিলের এই মুক্ত গতির একটি বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী পথ চলেও যে আনন্দের পরিচয় পায়নি, সমুদ্রচিল যেন স্বাভাবিকভাবেই সেই মুক্তির স্বাদ বহন করে।

রৌদ্র, সমুদ্র ও জীবনের উচ্ছ্বাস

‘সমুদ্রচিল’-এর জগৎ রৌদ্রোজ্জ্বল, গতিশীল এবং প্রাণময়। ফেনা, নীল ঢেউ, বাতাস, ঝিনুক, আকাশ—সবকিছু মিলে একটি প্রবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃশ্য তৈরি করেছে।

রৌদ্র এখানে কেবল আলো নয়; তা প্রাণের উচ্ছ্বাসেরও প্রতীক। সমুদ্রচিলের শরীর ও ডানায় সেই উচ্ছ্বাস যেন আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞান ও মানবসভ্যতার প্রশ্ন

‘বিজ্ঞান কি মস্তিষ্কের বাক্সের মতন একাকী?’—এই প্রশ্নে কবি আধুনিক বিজ্ঞান ও মানুষের অস্তিত্বের সম্পর্ক নিয়ে ভাবেন।

বিজ্ঞান মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতা বাড়ালেও মানুষের অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষা, বেদনা ও আনন্দের প্রশ্ন আলাদা থেকে যায়। কবিতায় সমুদ্রচিলের স্বাভাবিক জীবনশক্তির পাশে মানুষের জটিল সভ্যতাকে রাখার ফলে এই প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মানুষের দীর্ঘ যাত্রা ও অপূর্ণতা

কবি বলেন, মানুষ সহস্র শতাব্দী ধরে পথ ও ঘরের গন্ধে জীবন কাটিয়েছে, কিন্তু আনন্দের পরিচয় পায়নি। এই দীর্ঘ সভ্যতাযাত্রার বিপরীতে সমুদ্রচিলের স্বাভাবিক উড্ডয়ন এক অন্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

মানুষের অর্জন যতই বিস্তৃত হোক, তার অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষা ও অপূর্ণতা থেকে যায়।

পৃথিবী হারিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা

কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা হলো পৃথিবীর সীমিত পরিচয় থেকে বৃহত্তর প্রকৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়া। সমুদ্র, আকাশ ও রৌদ্রের বিস্তারের মধ্যে কবি পৃথিবীকে হারাতে চান।

এই হারিয়ে যাওয়া নেতিবাচক বিনাশ নয়; বরং প্রকৃতির বৃহত্তর সত্তার সঙ্গে নিজেকে একীভূত করার একটি কাব্যিক আকাঙ্ক্ষা।

কবিতার প্রধান প্রতীক ও চিত্রকল্প

সমুদ্রচিল — স্বাধীনতা, স্বাভাবিক জীবনশক্তি এবং সীমাহীন গতির প্রতীক।

সমুদ্র — অসীমতা, রহস্য ও অস্তিত্বের বিশালতার প্রতীক।

রৌদ্র — প্রাণ, আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও সৃষ্টিশীল শক্তির প্রতীক।

তরঙ্গ — পরিবর্তন, গতি ও জীবনের অবিরাম প্রবাহের প্রতীক।

নীল আকাশ — সীমাহীনতার অনুভূতি ও মুক্তির প্রতীক।

ধবল ডানা — মুক্তি ও স্বাভাবিক জীবনের প্রতীক।

শস্যের সন্তান — পৃথিবীর উৎপাদনশীলতা ও জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক।

নক্ষত্র — দূরত্ব, রহস্য ও মহাজাগতিক অস্তিত্বের প্রতীক।

মৃত্যু — জীবনের সমাপ্তির পাশাপাশি প্রকৃতির বৃহত্তর অস্তিত্বের মধ্যে ফিরে যাওয়ার এক সম্ভাব্য পরিণতি।

কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য

‘সমুদ্রচিল’ মানুষের সভ্যতা ও প্রকৃতির স্বাভাবিক জীবনের মধ্যে একটি গভীর বৈপরীত্য নির্মাণ করে। মানুষ বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ ও সভ্যতার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে; কিন্তু সেই অগ্রগতির মধ্যেও তার আকাঙ্ক্ষা ও অপূর্ণতা থেকে গেছে।

অন্যদিকে সমুদ্রচিল কোনো জটিল সভ্যতার ভার বহন করে না। সে রৌদ্র, বাতাস ও তরঙ্গের সঙ্গে মিশে স্বাধীনভাবে চলে। তার এই স্বাভাবিক গতিই কবির কাছে এক ধরনের অস্তিত্বের পূর্ণতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

কবিতার শেষে সমুদ্রচিল ও তার ‘বনিতা’-র ধবল পাখা ধীরে ধীরে নীল হয়ে আসে এবং কবি চান মৃত্যু যেন সেই দারুচিনি-হাওয়ার আশ্বাসে তাঁকে পায়। এখানে মৃত্যু ভয়াবহ সমাপ্তির চেয়ে প্রকৃতির বিশালতার মধ্যে মিশে যাওয়ার একটি শান্ত সম্ভাবনা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।

সংক্ষেপে

‘সমুদ্রচিল’ জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতি, সভ্যতা ও অস্তিত্বচেতনার একটি বিস্তৃত কবিতা। সমুদ্রচিলের উড্ডয়নকে কেন্দ্র করে কবি মানুষের দীর্ঘ সভ্যতাযাত্রা, বিজ্ঞানের সীমা, আনন্দের অনুসন্ধান, পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণ এবং মৃত্যুর সম্ভাব্য শান্তিকে একত্র করেছেন।

সমুদ্র, আকাশ, রৌদ্র ও তরঙ্গের বিপুলতার মধ্যে সমুদ্রচিল হয়ে ওঠে স্বাধীনতার প্রতীক। আর সেই স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে মানুষ নিজের দীর্ঘ ইতিহাস, অপূর্ণতা ও অস্তিত্বকে নতুন করে দেখতে শেখে।

মন্তব্য করুন