রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৪৪)-র একটি অত্যন্ত গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সময়চেতনায় সমৃদ্ধ কবিতা হলো ‘বলিল অশ্বথ সেই’। এই কবিতায় শতবর্ষ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মানুষের চিরন্তন প্রবাসপ্রবণতা, শেকড় ছেড়ে অন্যত্রে চলে যাওয়ার ব্যাকুলতা এবং জীবনের চরম সত্য—যেখানেই যাওয়া যাক না কেন, মানুষের মৌলিক দুঃখ-বেদনা ও স্বপ্নের কোনো রূপান্তর ঘটে না—তা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | দলিল অশ্বথ সেই / অশ্বথ (প্রামাণ্য পাঠে ‘অশ্বথ’ বা ‘বলিল অশ্বথ সেই’) |
| কবির নাম | জীবনানন্দ দাশ |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মহাপৃথিবী |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪৪ (১৩৫১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রূপকধর্মী ও মননশীল আধুনিক কবিতা (Allegorical and Contemplative Modern Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯৪৪ সালে ‘পূর্বাশা লিমিটেড’-এর পক্ষে সত্যপ্রসন্ন ঘোষের প্রকাশনায় ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। জীবনানন্দ দাশের কাব্যে নিসর্গ প্রকৃতির সাথে মানবজীবনের দুঃখ-বেদনা একাকার হয়ে গেছে। ‘বলিল অশ্বথ সেই’ কবিতায় গ্রামবাংলার চিরপরিচিত একটি অশ্বত্থ গাছ যেন সময়ের সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত। যুগ যুগ ধরে মানুষ ঘর ছেড়ে নতুন জীবনের সন্ধানে অনিশ্চিত পথে পা বাড়ায়, কিন্তু শেকড়ের টান এবং জীবনের অন্তর্নিহিত নিয়তি সর্বত্রই একই রয়ে যায়—এই শাশ্বত সত্যই কবিতায় মূর্ত হয়েছে।

বলিল অশ্বথ সেই – সম্পূর্ণ কবিতা
বলিল অশ্বত্থ ধীরে: ‘কোন দিকে যাবে বলো-
তোমরা কোথায় যেতে চাও?
এতদিন পাশাপাশি ছিলে, আহা, ছিলে কত কাছে:
ম্লান খোড়ো ঘরগুলো-আজও তো দাঁড়ায়ে তারা আছে;
এই সব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন দিকে কোন পথে ফের
তোমরা যেতেছ চলে পাইনাকো টের!
বোঁচকা বেঁধেছ ঢের,-ভোলো নাই ভাঙা বাটি ফুটা ঘটিটাও;
আবার কোথায় যেতে চাও?
‘পঞ্চাশ বছরও হায় হয়নিকো-এই-তো সেদিন
তোমাদের পিতামহ, বাবা, খুড়ো, জেঠামহাশয়
-আজও, আহা, তাহাদের কথা মনে হয়!-
এখানে মাঠের পারে জমি কিনে খোড়ো ঘর তুলে
এই দেশে এই পথে এই সব ঘাস ধান নিম জামরুলে
জীবনের ক্লান্তি ক্ষুধা আকাক্সক্ষার বেদনার শুধেছিল ঋণ;
দাঁড়ায়ে-দাঁড়ায়ে সব দেখেছি যে,-মনে হয় যেন সেই দিন!
‘এখানে তোমরা তবু থাকিবে না? যাবে চলে তবে কোন পথে?
সেই পথে আরও শান্তি- আরও বুঝি সাধ?
আরও বুঝি জীবনের গভীর আস্বাদ?
তোমরা সেখানে গিয়ে তাই বুঝি বেঁধে রবে আকাক্সক্ষার ঘর!..
যেখানেই যাও চলে, হয়নাকো জীবনের কোনো রূপান্তর;
এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা বিচ্ছেদের কাহিনী ধুসর
ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাক্সক্ষার ঘর!’
-বলিল অশ্বত্থ সেই নড়ে-নড়ে অন্ধকারে মাথার উপর।
Romanized Version
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
-
অশ্বত্থ গাছের বিস্ময় ও প্রশ্ন:“বলিল অশ্বত্থ ধীরে: ‘কোন দিকে যাবে বলো- / তোমরা কোথায় যেতে চাও?”— দীর্ঘকাল ধরে মানুষের জনবসতি ও জীবনের ওঠানামা দেখে চলা প্রাচীন অশ্বত্থ গাছটি অবাক হয়ে দেখছে যে মানুষ তার ঘরবাড়ি, মাঠঘাট এবং পুরোনো পরিচিত জীবন ছেড়ে আবার অজানা পথের দিকে পা বাড়াচ্ছে। তাদের হাতে বোঁচকা-বুঁচকি এবং সেই পুরোনো ভাঙা বাটি ও ফুটা ঘটিও রয়েছে।
-
স্মৃতি ও প্রজন্মের পরিক্রমা:“পঞ্চাশ বছরও হায় হয়নিকো-এই-তো সেদিন / তোমাদের পিতামহ, বাবা, খুড়ো, জেঠামহাশয়… এখানে মাঠের পারে জমি কিনে খোড়ো ঘর তুলে… জীবনের ক্লান্তি ক্ষুধা আকাক্সক্ষার বেদনার শুধেছিল ঋণ;”— গাছের দীর্ঘ জীবনের কাছে পঞ্চাশ বছর বা কয়েকটি প্রজন্ম যেন চোখের পলকের মতো। পূর্বপুরুষেরা এই মাটিতেই ঘর বেঁধেছিল, ঘাস-ধান-নিম-জামরুলের ছায়ায় তাদের জীবন কেটেছিল। গাছটি তাদের সেই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমস্ত সংগ্রাম ও বেদনার সাক্ষী।
-
পলায়নের ভ্রান্তি ও জীবনের অপরিবর্তনীয় সত্য:“যেখানেই যাও চলে, হয়নাকো জীবনের কোনো রূপান্তর; / এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা বিচ্ছেদের কাহিনী ধুসর / ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাক্সক্ষার ঘর!”— মানুষ হয়তো মনে করে নতুন কোনো জায়গায় গেলে জীবনে শান্তি ও গভীর আস্বাদ মিলবে। কিন্তু অশ্বত্থ গাছটির প্রাজ্ঞ উপলব্ধি হলো—স্থান বদলালেই মানুষের মূল ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। পৃথিবীর যে প্রান্তেই নতুন করে আশা বা আকাক্ষার ঘর বাঁধা হোক না কেন, মানুষের ক্ষুধা, স্বপ্ন, ব্যথা আর বিচ্ছেদের ধুসর কাহিনী সর্বত্রই একই রকমভাবে ফিরে আসবে।