‘উত্তরাধিকার’ কবিতা — সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান পুরুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, মনস্তাত্ত্বিক ও যুগান্তকারী কবিতা হলো ‘উত্তরাধিকার’। এই কবিতায় কবির ফেলে আসা যৌবন, তাঁর অভিজ্ঞতা, দ্রোহ, প্রেম, দুঃখ এবং জীবনের সমস্ত প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি একজন নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধি অর্থাৎ ‘নবীন কিশোর’-এর হাতে তুলে দেওয়ার এক অপূর্ব ও নস্টালজিক চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয় বিবরণ
কবিতার নাম উত্তরাধিকার
কবির নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কবিতার ধরন আত্মকথনমূলক ও প্রজন্মসংক্রমণকারী আধুনিক গীতি-কবিতা (Modern Confessional and Generational Transition Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪–২০১২) বাংলা সাহিত্যের এমন এক বরপুত্র যিনি তাঁর সাবলীল গদ্যশৈলী, তারুণ্যের দীপ্ত দ্রোহ এবং রোমান্টিক সংবেদনশীলতার জন্য চিরস্মরণীয়। ‘উত্তরাধিকার’ কবিতায় প্রবীণ বা পরিণত কবির জীবন থেকে তরুণের হাতে জীবনের ব্যাটন তুলে দেওয়ার এক অনন্য বার্তা রয়েছে। জীবনকে যেভাবে তিনি ভালোবেসেছেন, তার ভুলভ্রান্তি, পাগলামি, ব্যর্থতা এবং ভালোবাসার স্মৃতিচিহ্নগুলো—সবই যেন তিনি সঁপে দিচ্ছেন নবাগত তরুণের প্রজন্মের কাছে।

উত্তরাধিকার – সম্পূর্ণ কবিতা

নবীন কিশোর, তোমায় দিলাম ভূবনডাঙার মেঘলা আকাশ
তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর
ফুসফুস-ভরা হাসি
দুপুর রৌদ্রে পায়ে পায়ে ঘোরা, রাত্রির মাঠে চিৎ হ’য়ে শুয়ে থাকা
এসব এখন তোমারই, তোমার হাত ভ’রে নাও আমার অবেলা
আমার দুঃখবিহীন দুঃখ ক্রোধ শিহরণ
নবীন কিশোর, তোমাকে দিলাম আমার যা-কিছু ছুল আভরণ
জ্বলন্ত বুকে কফির চুমুক, সিগারেট চুরি, জানালার পাশে
বালিকার প্রতি বারবার ভুল
পরুষ বাক্য, কবিতার কাছে হাঁটু মুড়ে বসা, ছুরির ঝলক
অভিমানে মানুষ কিংবা মানুষের মত আর যা-কিছুর
বুক চিরে দেখা
আত্মহনন, শহরের পিঠ তোলপাড় করা অহংকারের দ্রুত পদপাত
একখানা নদী, দু’তিনটে দেশ, কয়েকটি নারী —
এ-সবই আমার পুরোনো পোষাক, বড় প্রিয় ছিল, এখন শরীরে
আঁট হয়ে বসে, মানায় না আর
তোমাকে দিলাম, নবীন কিশোর, ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও
অথবা ঘৃণায় দূরে ফেলে দাও, যা খুশি তোমার
তোমাকে আমার তোমার বয়সী সব কিছু দিতে বড় সাধ হয়।

Romanized Version

Nobin kishor, tomay dilam vubondangar meghla akash
Tomake dilam botambihin chhera shart ar
Fushfush-vhora hashi
Dupur roudre paye paye ghora, ratrir mathe chit h’ye shuye thaka
Eshob ekhon tomar-i, tomar hat v’re nao amar obela
Amar dukkhobihin dukkho krodh shihoron
Nobin kishor, tomake dilam amar ja-kichhu chhulo avoron
Jwolonto buke kofir chumuk, cigaret churi, janalare pashe
Balikar proti barobar bhul
Porush bakyo, kobitar kache hatu mure bosha, chhurir jholok
Abhimane manush kingba manusher moto ar ja-kichhur
Buk chire dekha
Atmohonon, shohorer pith tolpar kora ohongkarer druto podpat
Ekhane nodi, du’tinte desh, koyekti nari —
E-shobi amar purono poshakh, boro priyo chhilo, ekhon shorire
At hoye boshe, manay na ar
Tomake dilam, nobin kishor, ichhe hoy to onge jorao
Othoba ghrinay dure phele dao, ja khushi tomar
Tomake amar tomar boyoshi shob kichhu dite boro shadh hoy.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • তারুণ্যের সহজ সরল উত্তরাধিকার:
    “নবীন কিশোর, তোমায় দিলাম ভূবনডাঙার মেঘলা আকাশ / তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর / ফুসফুস-ভরা হাসি”
    — কবি তাঁর তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে নবীন কিশোরের হাতে তুলে দিচ্ছেন ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ, উদাসীনতা, বোতামহীন ছেঁড়া শার্ট এবং বুকভরা মুক্ত হাসি। এটি তারুণ্যের অকৃত্রিম স্বাধীনতা ও বোহেমিয়ান জীবনের পরিচয়।
  • অভিজ্ঞতা, দ্রোহ ও ভুলের রোমন্থন:
    “জ্বলন্ত বুকে কফির চুমুক, সিগারেট চুরি, জানালার পাশে / বালিকার প্রতি বারবার ভুল / পরুষ বাক্য, কবিতার কাছে হাঁটু মুড়ে বসা…”
    — যৌবনের আবেগ, খামখেয়ালিপনা, কফির পেয়ালা, কৈশোরের প্রেম ও ভুলত্রুটি, কবিতার প্রতি অগাধ আত্মসমর্পণ এবং অভিমানের ক্ষত—কবির জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা ও উন্মাদনা যেন উত্তরসূরির হাতে সঁপে দেওয়া হচ্ছে।
  • পুরোনো পোষাকের মতো জীবনকে ছেড়ে দেওয়া:
    “এ-সবই আমার পুরোনো পোষাক, বড় প্রিয় ছিল, এখন শরীরে / আঁট হয়ে বসে, মানায় না আর… ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও / অথবা ঘৃণায় দূরে ফেলে দাও, যা খুশি তোমার”
    — জীবনের এই বিশাল সমাহার কবির কাছে আজ একটি পুরোনো পোষাকের মতো, যা বয়সের ও অভিজ্ঞতার ভারে শরীরে আর ঠিকমতো মানায় না। তাই তিনি তা নবীন প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে চান—তরুণরা তা ভালোবেসে গ্রহণ করতে পারে কিংবা ঘৃণায় দূরে ছুড়ে ফেলতে পারে, তাতে কবির কোনো দ্বিমত নেই।
উৎস
কবিতাটির প্রামাণ্য পাঠ ও বানানরীতি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্বাচিত কবিতা ও রচনাবলির প্রামাণ্য মানদণ্ড অনুসরণ করে আপনার নির্ধারিত বিন্যাসে নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।