‘অব্যর্থ আঙুল’ কবিতা — আবু হাসান শাহরিয়ার

বাংলাদেশের সমকালীন আধুনিক কাব্যাঙ্গনের অন্যতম প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক আবু হাসান শাহরিয়ার রচিত একটি অত্যন্ত আবেগময়, রোমান্টিক ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘অব্যর্থ আঙুল’। এই কবিতায় প্রেম ও ভিক্ষাবৃত্তির এক অপূর্ব বিপরীত রূপকের মাধ্যমে প্রিয়ার প্রতি কবির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ এবং মহীয়ান চাওয়ার এক অনন্য শিল্পরূপ ফুটে উঠেছে।

অব্যর্থ আঙুল

কবিতার মূল তথ্য

বিষয় বিবরণ
কবিতার নাম অব্যর্থ আঙুল
কবির নাম আবু হাসান শাহরিয়ার
কবির জন্ম ২৫ জুন, ১৯৫৯
কবিতার ধরন রোমান্টিক ও আত্মনিবেদনমূলক আধুনিক গীতি-কবিতা (Romantic and Confessional Modern Poem)

 

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

আবু হাসান শাহরিয়ার বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ভুবনে এক প্রজ্ঞাবান ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত নাম। তিনি দৈনিক ‘আমাদের সময়’-এর সম্পাদক এবং ‘দৈনিক যুগান্তর’ ও ‘দৈনিক মুক্তকণ্ঠ’-এর মতো শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কবিতায় নাগরিক জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতি, প্রেমের দীপ্তি এবং শিল্পবোধ অত্যন্ত যত্নের সাথে প্রকাশিত হয়েছে। ‘অব্যর্থ আঙুল’ কবিতায় কবি নিজেকে এক ‘রাজভিখিরি’ হিসেবে কল্পনা করেছেন, যার সাধারণ কোনো ভিক্ষায় মন ভরে না—তার চাওয়া শুধু রাজকুমারী এবং তার নিঃশর্ত সান্নিধ্য।

অব্যর্থ আঙুল – সম্পূর্ণ কবিতা

ভিক্ষা -যদি করিই, হবো রাজভিখিরি

সোনার থালা ধরব মেলে—
দিতে চাইলে মোহর দিও রাজকুমারী,
মোহর দিও, মোহর দিও, মোহর দিও।

কানাকড়ির চেয়ে আমার শূন্য থালা, সোনার থালা
অনেক দামী।
তাই সামান্য দিলে আমার ভরবে না মন,
ভিক্ষা -যদি করিই, তুমি মোহর দিও৷

রাজকুমারী, তোমাকে চাই। নেই অর্ধেক রাজত্বে লোভ।
রাজমুকুটের লালসা নেই, সিংহাসনে বসার চেয়ে
তোমার পায়ের কাছে ব’সে থাকা
অধিক প্রিয়।

তাই সামান্য দিলে আমার ভরবে না মন,
ভিক্ষা -যদি করিই, তুমি মোহর দিও।

 

বাংলাদেশি কবিদের তালিকা

Romanized Version

Bhiksha -jodi korii, hobo rajbhikhiri
Shonar thala dhorbo mele—
Dite chaile mohor diyo rajkumari,
Mohor diyo, mohor diyo, mohor diyo.
Kanakorir cheye amar shunyo thala, shonar thala
Anek dami.
Tai shamanno dile amar vorbe na mon,
Bhiksha -jodi korii, tumi mohor diyo.
Rajkumari, tomake chai. Nei ordhek rajotte lobh.
Rajmukuter lalsha nei, singhasone boshar cheye
Tomar payer kache b’se thaka
Odhik priyo.
Tai shamanno dile amar vorbe na mon,

Bhiksha -jodi korii, tumi mohor diyo.

বাংলাদেশি কবিদের তালিকা

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • রাজভিখিরির অহংকার ও সোনার থালা:
    “ভিক্ষা -যদি করিই, হবো রাজভিখিরি / সোনার থালা ধরব মেলে—”
    — কবি যদি প্রেমের দরজায় ভিক্ষার্থী হনও, তবে তিনি সাধারণ কোনো ভিখিরি হবেন না; তিনি হবেন ‘রাজভিখিরি’। তাঁর হাতের ভিক্ষার থালাটিও সাধারণ নয়, তা সোনার থালা। তাঁর আত্মসম্মান ও চাওয়ার পরিধি এতটাই বিশাল যে সামান্য কিছু দিয়ে তাঁর মন তুষ্ট করা সম্ভব নয়।
  • মোহরের আকুতি ও তুচ্ছতা:
    “দিতে চাইলে মোহর দিও রাজকুমারী, / মোহর দিও, মোহর দিও, মোহর দিও।”
    — কবির আকুল আবেদন রাজকুমারীর কাছে—তিনি যেন সামান্য কানাকড়ি বা অবমূল্যায়ন না করে সোনার মোহরই দান করেন। কবির শূন্য থালা বা সোনার থালা কানাকড়ির চেয়ে অনেক বেশি দামি, তাই তুচ্ছ প্রাপ্তি তাঁর অহংকার ও প্রেমের তীব্রতাকে ক্ষুণ্ন করবে।
  • রাজত্ব বা মুকুটের চেয়ে প্রিয়ার সান্নিধ্য শ্রেয়:
    “রাজকুমারী, তোমাকে চাই। নেই অর্ধেক রাজত্বে লোভ। / রাজমুকুটের লালসা নেই, সিংহাসনে বসার চেয়ে / তোমার পায়ের কাছে ব’সে থাকা / অধিক প্রিয়।”
    — রূপকথার গল্পের মতো প্রিয়ার প্রেমে অন্ধ কবি অর্ধেক রাজত্ব বা ক্ষমতার রাজমুকুটের কোনো লোভ রাখেন না। পার্থিব কোনো অর্জন বা সিংহাসনের ক্ষমতা তাঁর কাছে তুচ্ছ; প্রিয়ার পদতলে বা সান্নিধ্যের কাছে বসে থাকাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও পরম শান্তি। প্রেমের এই চরম ও নিঃশর্ত আত্মনিবেদনই কবিতাটির মূল প্রাণস্পন্দন।
উৎস
কবিতাটির প্রামাণ্য পাঠ এবং কবির ঐতিহাসিক পরিচিতি কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের কাব্যিক মানদণ্ড ও প্রামাণ্য সংকলন অনুসারে আপনার নির্ধারিত বিন্যাসে নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন